April 10, 2018

ম্যানেজ মকবুল

পলাশ মাহবুব

মকবুল চাচার সবই ভালো শুধু একটা জিনিস ছাড়া। মকবুল চাচার শুধু দাঁড়িয়ে পড়ার অভ্যাস।
না, তিনি ট্রাফিক পুলিশে চাকরি করেন না বা কখনো করেনওনি যে সেখান থেকে দাঁড়ানোর অভ্যাসটা পেয়েছেন। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন তার এই দাঁড়ানোর অভ্যাসটা হয়েছে। ইলেকশন শব্দটা কানে আসা মাত্র আমাদের মকবুল চাচা এক মুহুর্ত দেরি করেন না। ঠাস করে দাঁড়িয়ে পড়েন। হোক সেটা এলাকার চেয়ারম্যান নির্বাচন, কিংবা স্কুলের অভিভাবক নির্বাচন অথবা তুচ্ছ সমবায় সমিতির নির্বাচন কিংবা অন্যকিছু। ছোট হোক বড় হোক মকবুল চাচার হাত থেকে কোনও নির্বাচনের রেহাই নেই। একবার তো সংরক্ষিত নারী আসনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন বলে। পরে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো ওটা মেয়েদের নির্বাচন। কিন্তু মকবুল চাচা তাও বুঝতে চান না।
তোরা এগিন কিতা কস? মাইয়া মাইনসের ইলেকশন আবার কি জিনিস! জগতে নারী-পুরুষ ব্যাবাক সমান। দিন-দুনিয়ার খবরতো কিছু রাখস না। আই রাখি।
মকবুল চাচা খবর রাখেন ঠিকই তবে সেটা ইলেকশনের খবর। এলাকার একমাত্র ছাপাখানার মালিক আমাদের মকবুল চাচা। একমাত্র ছাপাখানা হওয়ায় সেটা বহু আগেই দাঁড়িয়ে গেছে। তারপর দাঁড়াতে শুরু করেছেন মকবুল চাচা। ইলেকশনের সাথে যেহেতু ছাপাখানার একটা সম্পর্ক আছে তাই খবর পেতে মকবুল চাচার খুব একটা অসুবিধা হয় না। ইলেকশনের আওয়াজ উঠলে সে আওয়াজ প্রথমে যেখানে পৌঁছে তা হচ্ছে ছাপাখানা। ইলেকশনের আওয়াজ হচ্ছে পোস্টারনির্ভর। পোস্টার ছাপাতে সবাই ছাপাখানায় আসে। আর মকবুল চাচা ছাপাখানায় বসে ইলেকশনের গরম খবর পেয়ে যান। তারপর চরম উত্তেজনা নিয়ে প্রথম যে কাজটা করেন তা হচ্ছে অন্য অনেকের পোস্টারের সাথে নিজের নামেও একটা পোস্টার ছাপিয়ে ফেলেন। ইদানিং সাদাকালো পোস্টারের নিয়ম হওয়ার মকবুল চাচার আরও সুবিধা হয়েছে। আওয়াজ তুলতে তার বেশি খরচাপাতি হয় না। কিছু পোস্টার ছাপিয়ে বাজারের আশেপাশের দেয়ালে লাগিয়ে দেন। তারপর যা হওয়ার তা অটোমেটিক্যালি হয়ে যায়। একই পদের অন্য প্রার্থীরা গোপনে মকবুল চাচার কাছে আসেন।
কেন আসেন?
সবাই হয়তো ভাবছেন আমাদের মকবুল চাচা ভীষণ নির্বাচনমুখী মানুষ। ব্যাপারটা আসলে আদতে সেরকম কিছু না। মকবুল চাচার দৌড় ওই দাঁড়ানো পর্যন্তই। অন্যভাবে বললে তিনি মূলত দাঁড়ানোর জন্যই দৌঁড়ান। নির্বাচনে জিতবেন কি জিতবেন না, কয় ভোট পাবেন কি পাবেন না সেসব নিয়ে তিনি একদমই চিন্তা করেন না। চিন্তা করবেনইবা কেন? তিনি তো ভোট পর্যন্ত যাবেনই না। তার হিসাব অন্য। আর সেটা বাস্তবায়ন করতে নির্বাচন আসামাত্র তিনি দাঁড়িয়ে যান। আশেপাশে আর কে দাঁড়ালো সেসব নিয়েও তার কোনও মাথাব্যাথা নেই। বহুবার আপন আত্মীয়-স্বজনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি সম্পর্ক খারাপ করেছেন। তাও অভ্যাস ছাড়তে পারেননি কিংবা ইচ্ছে করেই ছাড়েননি। ব্যবসা হচ্ছে নেশার মতো। সহজে ছাড়া যায় না। নির্বাচনে দাঁড়ানো মকবুল চাচার এক প্রকার ব্যবসা। মৌসুমী ব্যবসা।
তো সিজনাল নির্বাচন ব্যবসায়ি মকবুল চাচা একবার করলেন কি, নিজের বড় ভাইয়ের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন।
খবর শুনে বড় ভাই আসলেন তার কাছে।
কিরে মকবুল তুই বলে ইলেকশনে খাড়াইছোস? হাছা নি?
হ ভাইজান। আই তো খাড়াই গেছি গুই। পোস্টারও ছাপা হই গ্যাছে।
ওমা! কি কছ? তুইতো জানোস এইবার আঁই খাড়ামু। তুই খাড়াইছোস কিল্লাই! তোর অভ্যাস কি ভালা হইতো নো নি, ক্যান?
আই কিত্তাম ভাইজান? আন্নে তো জানেন আর ইলেকশনে খাড়ানোর অভ্যাস। অহন আন্নেরা আরে ম্যানেজ করেন।
মকবুল চাচাকে ম্যানেজ করাও খুব কঠিন কিছু না। মূলত ম্যানেজ হওয়ার জন্যই তিনি ইলেকশনে দাঁড়ান। প্রথমদিকে কয়েক দিন গাই-গুঁই করেন। নিজের দাম বাড়ান। তারপর এক পর্যায়ে ম্যানেজ হয়ে যান। ইলেকশনের গুরুত্ব অনুযায়ি মকবুল চাচার হাতে কিছু ধরিয়ে দিলেই তিনি ছাপাখানার ইজি চেয়ারে বসে পড়েন। অল্প কিছু পোস্টার যা ইতিমধ্যে আশেপাশে লাগানো হয়েছে সেসবের ওপরও অন্য পোস্টার উঠে যায়। এভাবেই দিনে দিনে এলাকায় তিনি ম্যানেজ মকবুল হিসেবে পরিচিতি পান।
খেয়াল করে দেখা গেছে এলাকায় এ যাবত যত নির্বাচন হয়েছে প্রায় সব নির্বাচনেই মকবুল চাচা দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু একটা নির্বাচনও শেষ পর্যন্ত করেননি। কোনও না কোনও পর্যায়ে ম্যানেজ হয়ে বসে পড়েছেন। এই নিয়ে অবশ্য মকবুল চাচার মধ্যে কোনও আফসোস নেই। থাকার কথাও না। কিন্তু এলাকার ময়-মুরুব্বি যারা সাধারনত ইলেকশন-টিলেকশন করেন, এলাকার মাতবরি-সর্দারিতে থাকেন তাদের মধ্যে একটা সহানুভূতির ব্যাপার তৈরি হয়েছে দিনে দিনে।
আহারে, মকবুইল্যা বার বার ইলেকশনে খাড়ায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত কইরতে পারে না। প্রেত্যেকবার হ্যাতের বসি যাওন লাগে। মকুবইল্যার বিষয়গা ভাবি দেইখতে হইবো। কি কস?
হ হ। কথা ঠিক। বিষয়গা ভাবি দেখোন দরকার।
সবাই সবার কথায় সায় দেয়। তারা মকবুল চাচার বিষয়টা নিয়ে ভাবে। এবং এক পর্যায়ে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, মকবুল চাচাকে একটা ছাড় দেয়া হবে। সামনে যে ইলেকশন আসছে সেখানে মকবুল চাচার বিপক্ষে কেউ দাঁড়াবেন না। আর এটা মকবুল চাচার জন্য সবার পক্ষ থেকে একটা সারপ্রাইজ। বিষয়টা তাই গোপণ ছিল।
গোপণ কথা তো মকবুল চাচার জানার কথা না। তিনি তাই স্বভাবমত পরবর্তী যে ইলেকশন ছিল সেখানে মেম্বার পদে দাঁড়িয়ে পড়েন। কিছু পোস্টার লেগে যায় আশপাশের দেয়ালে।
দেয়ালে পোস্টার লাগিয়ে মকবুল চাচা আছেন ম্যানেজ হওয়ার খেয়ালে। একদিন যায়, দুইদিন যায়, তিনদিন যায় কিন্তু ম্যানেজ করার জন্য মকবুল চাচার কাছে কেউ আসে না। এরকমতো কখনো হয় না।
ঘটনা কি!
মকবুল চাচা ঘটনা জানার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে ঘটনা জানতেও পারেন। ঘটনা জানতে পেরে মকবুল চাচার মাথা খারাপ।
হায়! হায়! তিনি যে পদে দাঁড়িয়েছেন সে পদে আর কেউ দাঁড়াচ্ছেই না! তার মানে তাকে ম্যানেজ করবার মতো কেউ নেই। তাহলে উপায়?
এবার মকবুল চাচা উল্টো দৌঁড়-ঝাঁপ শুরু করলেন। যেভাবেই হোক একজনকে অন্তত ম্যানেজ করতে হবে যিনি এই পদে দাঁড়াবেন। তা না হলে তার সর্বনাশ হয়ে যাবে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে মকবুল চাচার এতদিনের ম্যানেজ বিজনেস একদম মাঠে মারা যাবে। অন্তত পাঁচ বছর তিনি আর নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না।
অসহায় মকবুল চাচা একজন পার্থী ম্যানেজের জন্য ছুটোছুটি করতে লাগলেন। প্রার্থীকে সৎ এবং যোগ্য হতে হবে তেমন কোনও কথা নেই। এতোদিনের পুরনো বিজনেস ম্যানেজ করার জন্য জন্য তার একজন প্রার্থী প্রয়োজন।

Categories: রম্য

Tags:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *